Archive for June, 2015

সদা সত্য

Posted: June 25, 2015 in Uncategorized

কে কাদেঁ
মনের ভেতরে লোকায়িত ঝেড়ে ফেলে
কেউ কাদায়ঁ
মনের ভেতরে কু-মতলব ঝমিয়ে
অন্যকে শাসায়।

কেউ ভালবাসে
মনের সকল আশার রূপকে পরিপূর্ণতা দিতে
কেউ ভালবাসায়
কাম লালসার মাঝে প্রকৃত ভালবাসাকে ঠকাতে।

কেউ নেশা করে
অন্তরে লোকায়িত কষ্টকে ভূলে থাকতে
কেউ নেশা করায়
সমাজকে কলুষিত করতে।

কেউ ধর্মের রীতিতে মাথা নত করে বার বার
ভবেন না কভূ পৃথিবীর নিকট দায় বদ্ধ তার
কেউ ধর্ম  কোন ধার ধারেনা,
ভাবেন
মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ত কোথায়।

কম বেশি ভুল সবারই হয়। কিন্তু সেই ভুল যখন এতটাই হয়ে পরে যে সেটা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় তখন সেটা নিয়ে আলোচনা হবে এমনটাই স্বাভাবিক। আসুন দেখি ইতিহাসের সেরা কিছু ভুল এবং তার কারন জানি

bashor_17_6490363875529ee68bf1955.15162820_xlarge২২) ১১৭ বছর ধরে নির্মান করা হয় ইতালির বিখ্যাত পিসার হেলানো মিনার। আর সেটা হেলতে সময় নেয় মাত্র ১০ বছর। আজব ব্যাপার হল মাত্র ২০০৮ সালে এসে প্রায় শ খানেক ইঞ্জিনিয়ার এর সমস্টিগত প্রচেস্টায় এটার হেলানো বন্ধ হয় এবং ইঞ্জিনিয়াররা ঘোষনা দেন আগামি ২০০ বছরে এটি আর হেলবে না। প্রধানত নির্মানের সময় বেইজের দুর্বলতার কারনে এটি হেলা শুরু করে। পরবর্তিতে বেইজে প্রচুর কাজ করা সত্বেও এটি হেলতেই থাকে।

bashor_17_156575860355098d71774537.07276932_xlarge২১) টাই টানিকে প্রচুর মানুষ মারা যাওয়ার প্রধান করা হিসাবে ধরা হয় এটিতে যথেস্ট পরিমানে লাইফ বোট ছিল না। কিন্তু পরবর্তিতে জানা যায় জাহাজ কর্তৃ পক্ষ ইচ্ছা করেই যথেস্ট লাইফ বোট রাখেইনি কারন তাদের ধারনা ছিল এটি “unsinkable” বা কখনোই ডুববে না।

bashor_17_203000122955099636e13120.73826517_xlarge২০) নাসা ১৯৯৯ সালে Mars Climate Orbiter নামক একটা মহাকাশ যান খুব হাস্যাকর একটা কারনে হারিয়ে ফেলে যেটা মঙ্গল গ্রহকে প্রদক্ষিন করছিল। কারন ছিল লকহিড মার্টিন যারা মহাকাশ যানটিকে তৈরি করেছিল তাদের সফ্টওয়ারটি ছিল আমেরিকান ইউনিট সিস্টেমে। আর নাসা র কম্পিউটারগুলা চলতেছিল ব্রিটিশ উনিট সিস্টেমে। ফলে দুইটার ক্যালকুলেশনে ব্যাপক গোলমাল লেগে যায় আর হাজার কোটি টাকার আস্ত একটা মহাকাশ জান মঙ্গলগ্রহের মাটিতে আছরে পরে।

bashor_17_841937262550997250adc01.95927397_xlarge১৯) ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন ভেবেছিলেন তিনি শীত কালে রাশিয়া আক্রমন করে পুরো রাশিয়া দখল করে নিতে পারবেন। পরবর্তিতে তিনি স্বিকার করেছিলেন এটি ছিল তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভুল। অর্ধেক সৈন্য প্রচন্ড ঠান্ডয় মারা যায় আর বাকি অর্ধেক খাবারে অভাবে অভুক্ত অবস্থায় প্রচন্ড খারাপ অবস্থায় ফ্রান্সে ফিরে আসে।

১৮) হে হে হে হে …………. আমাদের হিটলার বাবাজি মনে করছিলেন তিনি নেপোলিয়ন এর থেকে আরো একটু বেশি ভালো করবেন। তাই তিনিও শীত কালে রাশিয়া আক্রমন করে বসেন। যে যাই বলুক জার্মানরা পুরো বিশ্ব যুদ্ধে হেরে যাওয়ার এটাই প্রধান কারন। রাশিয়ার সেই দুধর্ষ শীত।

১৭) ১২১৯ সালে চেঙ্গিস খান তৎকালি পারস্য(ইরান) শাষকের কাছে তিনজন রাস্ট্রদুত পাঠিয়েছিলেন শান্তি আলোচনার জন্য যাদের একজন চাইনিজ এবং দুইজন মুসলিম ছিলেন। পারসিয়ানরা তাদের মাথা কেটে শুধু দেহটা ঘোরার পিঠে বেধে চেঙ্গিস খানের কাছে ফেসত পাঠায়। চেঙ্গিস খান পারস্যের এক কোনা দিয়ে যুদ্ধ আর ধংস্ব শুরু করেন ঠিক আরেক কোনয়া গিয়ে ক্ষান্ত দেন। পুরো পারস্যতে কয়েক কোটি মানুষ নিহত হয় শুধু মাত্র এই সামান্য ভুলটার জন্য। গোয়ার্তুমিও বলা চলে।

১৬) ডাচরা মানে কিংডম অফ নেদারল্যান্ড ব্রিটিশদের প্রায় ১০০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া আবিস্কার করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এটাকে একটা ব্যাবহার অযোগ্য মরুভুমি বলে ফেলে গিয়েছিল। অথছ ব্রিটিশরা আজও অস্ট্রেলিয়ার কর্তা হিসাবে চলতেছে। আর আমার ধারনা অর্থনৈতিক দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ব্রিটিশরা।

১৫) রাশিয়া তার আলাস্কা নামক অঞ্চলটা আমেরিকার কাছে মাত্র দুই সেন্ট আর এক একর জমির বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছিল কারন তাদের ধারনা ছিল এত বরফের মধ্যে আসলে কিছুই নেই আর এটা একেবারেই ইউজলেস হবে। পরবর্তিতে এই বরফঢাকা অঞ্চলটিই এখন আমেরিকার বিশাল সম্পদে পরিনত হয়েছে।

১৪) ইনকা সম্রাট Atahualpa স্প্যানিশ কর্নেল Francisco Pizarro এর সাথে দেখা করতে সম্মত হন যখন তার ৮০ হাজার সৈন্য Francisco Pizarro এর মাত্র ২০০ ঘোর সওয়ার সৈন্যের সাথে পরাজিত হয়। ঘটনাটা এতটাই মারাত্মক ছিল যে পরবর্তিতে পুরো ইনকা সম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং তারা একেবারে পৃথিবীর বুক থেকে পুরোপুরি বিলিন হয়ে যায়। অনেকেই বলে থাকেন Francisco Pizarro ইনকাদের উপর মারাত্মক গনহত্যা চালিয়েছিলেন।

১৩) একটা সামান্য কাঠের ঘোরা তাদের শহের ঢুকানোর ভুলের মাসুল হিসবে পুরো ট্রয় নগরি ধংস্ব প্রাপ্ত হয়। মারাত্মক এই ভুলের গল্পটা সবারই জানা আছে। ঘোরার ভিতরে থাকা গ্রিক সৈন্যরা পরবর্তিতে রাতের আধারে ট্রয় নগরির প্রধান গেট খুলে দেন এবং পুরো ট্রয় ধংস্ব প্রাপ্ত করে গনহত্যা চালায় গ্রিকরা।

১২) ১৯৩৬ সালে জার্মানরা তৎকালিন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এয়ার শীপ নির্মান করে যার নাম ছিল হাইডেনবার্গ(LZ 129 Hindenburg)। কোন শালার বুদ্ধিতে তারা সেটার পুরো বেলুনটা হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়া ভর্তি করেছিল। ফলে ঠিক তার পরের বছর ১৯৩৭ সালে সামান্য একটা আগুন পুরো একটা ভয়ানক বিস্ফোরনের সৃস্টি করে। ভুল কারে বলে।

১১) ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের ১৫০০ বছর পুরো সম্রাজ্য বাইজাইন্টাইন এর রাজধানি কন্সটান্টিপোল(বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুল) দখল কর নেন মাত্র ২১ বছর বয়সি অটোমান সুলতাম দ্বিতিয় মেহমেদ। কারন কেউ একজন শহরের বাউন্ডরি ওয়ালের একটা ছোট দরজা ভুলে খুলে রেখে গেছিল। আজকের তুরস্কের রাজধানি ইস্তাম্বুল হওয়ার পিছনে এই ছোট ভুলটাই ছিল কারন।

১০) ১৪ শতকে চাইনিজ সম্রাজ্য তার সমস্ত নেভি ইউনিট গুলো বন্ধকরে দেয় এবং নিজেদেরকে একেবারে একধরে করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। অদ্ভুদ এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের পুরো উপকুল সম্পুর্নরুপে অরক্ষিত হয়ে পরে এবং পরবর্তিতে বেশকেয়কটি যুদ্ধে তারা অনেক অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

৯) ১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়ার তৎকালিন শাষক Archduke Franz Ferdinand এর ড্রাইভার ভুল করে একটা রং টার্ন নিয়ে ফেলে। ফলে গারিটি সরাসরি তার হত্যাকারি সার্বিয়ান Gavrilo Princip এর সামনে গিয়ে পরে এবং খুব সহজেই সে Archduke Franz Ferdinand কে হত্যা করে। Archduke Franz Ferdinand হাঙ্গেরির প্রিন্স ছিলেন এবং তিনি পরবর্তি রাজা হতেন। পরবর্তিতে হাঙ্গেরি এবং তার মিত্ররা সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলে ইংল্যান্ড সহ সার্বিয়ার বাকি সহোযোগিরা উল্টা যুুদ্ধ ঘোষনা করে বসে। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। দুই দুইটা মারাত্মক বিশ্বযুদ্ধ এরানো সম্ভব হত যদি সেইদিন ড্রাইভার এই সামান্য ভুলটা না করতো।

৮) জাপানিস রা দ্বিতিয়া বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার নোঘাটি পার্ল হারবার এর আক্রমন করে এমন সময় যখন তাদের একটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারও সেকানে ডক করা ছিল না। অথচ সাধারনত সেখানেই বেশিরভাগ সময়ই জাহজ গুলো সেখানে থাকার কথা থাকে। যদি সে সময় এই জাহজাগুলো ধংস করতে পারত যুদ্ধে আমেরিকার এত শক্ত উপস্থিতি থাকতো না। আর এর জন্যই অনেকে বলে থাকেন এই আক্রমনের পিছনে আমেরিকার হাত ছিল।

৭) রাশিয়ার চেরোনেভিল পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনার পিছনে দায়ি করা হয় খারাপ কন্সট্রাকশন। ধারনা করা হয় যেই ইঞ্জিনিয়ার এই পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টির কন্সট্রাকশন সুপারভাইজ করার দায়িত্বে ছিলেন তিনি বেশি কিছু স্থানে স্ট্রাকচারাল ভুল করেছিলেন। যেটা পরবর্তিতে মারাত্মক এক বিস্ফোরন আর রেডিয়শন সৃস্টি করে। প্রায় লক্ষাধিক মানুষ নিহত এবং প্রচুর মানুষ পঙ্গু হয়ে যায়। পুরো একটা আস্ত শহর পরিত্যাক্ত হয়ে পরে।

৬) সেই ১২ জন বই পাবলিশার বা প্রকাশক যারা জে.কে রাওলিংকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে যে হ্যারি পটার নামক এই ফালতু বই কেউ কিনবে না। পরবর্তিতে Bloomsbury Publishing কম্পানি প্রথম বইটি প্রকাশ করতে রাজি হয় যাতে লেখিকাকে তারা মাত্র ২৫০০ পাউন্ড পারিশ্রমিক দিয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে পরবর্তি বইয়ের জন্য তারা তাকে দিয়েছিল ১ লক্ষ পাউন্ড। আর তার পরে তো ইতিহাস।

৫) আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট পু্রো পৃথিবী দখল করেছিলেন। তার বিশাল এই সম্রাজ্য শাষন করার জন্য তিনি বেশি দিন বেচে থাকতে পারেন নি। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরন করেন কিন্তু মারা যাওয়ার আগে তিনি তার কোন উত্তরসুরির নাম বলে যাননি। যেটি পরবর্তিতে সরাসরি তার এই বিশাল সম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে।

৪) কার্থেজিয়ানরা রোম আক্রমনের সময় তাদের মিলিটারি জেনারেল এবং ধারনা করা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জেনারেলদের একজন হ্যানিবল বার্কাকে কোন siege ইকুইপমেন্ট যেমন Ballista, Mangonel , Trebuchet (আমার Catapult পোস্টে ডিটেইলস বলা আছে) দেয়নি। যেটা ছিল ইতিহাসের চরম একটা ভুল সিদ্ধান্ত। কারন হ্যানিবল এর হাতে যদি তখন এগুলো থাকতো সে নিশ্চি ভাবে ধরে নেয়া যায় পুরো রোমান সম্রাজ্য মাটির সাথে মিশিয়ে দিতো। এবং বর্তমান পৃথিবীতে রোমানদের বদলে কার্থেজিয়ানদের স্তুতি শোনা যেত।

৩) আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে আগুন দিয়ে ধংস্ব করাটা ছিল ইতিহাসের আরেক ভুল। কে দিয়েছে সেটা আজও জানা যায় নি কিন্তু এই আগুনের ফলে পৃথিবীর ইতিহাসের সেরা কিছু জ্ঞান-বিজ্ঞান হারিয়ে গেছে চিরতরে। ওই লাইব্রেরিটা থাকলে পৃথিবী বর্তমন অবস্থান থেকে আরও এগিয়ে থাকতো। সম্বভত আমরা আজকে অন্য কোন গ্রহে বসতি করতে পারতাম।

২) ৪৪ খ্রিস্টপুর্বে রোমান রিপাবলিকের সম্রাট জুলিয়াস সিজার বিখ্যাত perpetuo ঘোষনা করেন যেখানে তিনি পুরো রোমান রিপাবলিকের একক অধিপতি বনে যান। কিন্তু বিষয়টা রোমান সিনেট সদস্যাদের মোটেই পছন্দ হয় নাই এবং তারা ধারনা করেন সম্রাট সিনেট বন্ধ করে একক ভাবে সম্রাজ্য শাষন করার চেস্টা করছেন। তাই তারা সম্রাটকে হত্যা করেন আততায়ির মাধ্যমে গুপ্ত হত্যা করে। কিন্তু বিষয়টা যে একটা মারাত্মক ভুল ছিল তা পরবর্তিতে তারা উপলব্ধি করেন যখন পুরো রোমান সম্রাজ্যে ভায়নক অন্তর্যুদ্ধ শুরু হয় এবং বিশাল সম্রাজ্য প্রায় ধংসের দারপ্রন্তে উপনিত হয়।

১) ১৭৮৮ সালে প্রায় লক্ষাধিক অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনি বর্তমান রোমানিয়ার Caransebeş শহরে ঘাটি গারে অটোমান সেনাবাহিনিকে পরাস্ত্র করার জন্য। কিন্ত কোন এক অদ্ভুদ কারনে অনোমান বাহিনি আসার আগেই অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনি একটি অংশ তাদের বিপরিত দিকে থাকা আরেকটি অংশকে মনে করে বরে অটোমান সেনাবাহিনি। ফলশ্রুতিতে নিজেদের মধ্যে একটা ভুল যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং আহত হয় কমপক্ষে আরো ২৫-৩০ হাজারের মতন। আর ততক্ষনে অটোমান সেনাবাহিনি এসে দেখে যুদ্ধ শেষ পুরো শহর তারা খুব শান্তিতে পায়ে হেটে হেটে দখল করে নেয়। এত বড় মারাত্মক ভুল ইতিহাসে আর কেউ করেছে কিনা সন্দেহ আছে।

লেখটি নাম না জানা প্রিয় এক ব্লগার ভাইয়ের পোষ্ট হতে কপি করা  পোষ্টটি নজরে এলে দয়া করে আওয়াজ দিবেন।আমি কেবল  সংগ্রহে রাখার জন্য সংগ্রহ করেছি মাত্র।এর সমস্ত কৃতিত্ব আপনার।

gfccfcআকাশে প্রচুর মেঘ উটকো বাতাসে মেঘেরা কখনো ডানে কখনো বা বায়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সুযোগ পেলেই হঠাৎ মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে কর্ম চঞ্চল মানুষগুলোকে এলো মেলো দিয়ে আবারও মেঘেরা খেলা করে এলো মেলো ভাবে খোলা বাতাসে।মেঘদের মতো সূর্য্যদের মনেও বাসা বাধে এক অজানা আতংক।চৌয়াল্লিশটি বছরের মনে লালিত কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণে হতাশা।মা জাহানারা ইমাম যা শুরু করে গিয়েছিলেন সেই নরপশু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তা এই নতুন প্রজন্মদের মাঝে ফেলিত দায়ীত্ত্ব পালনে তারা সংকল্পবদ্ধ।
রাজাকার মুজাহিদ এক জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী তাকে বাচাতে উৎ পেতে আছে স্বদেশীয় কিছু নব্য রাজাকারের দল।ভাবতে অবাক লাগে তার সন্তান কি ভাবে তাকে পিতা বলে ডাকে!সে তো একজন অপরাধী তাও আবার যুদ্ধাপরাধী আজ রাজাকারদের সন্তানদের মনে যদি সামন্যতম দেশপ্রেম থাকত তবে হয়তো কেউ না কেউ পিতার বিরুদ্ধে দেশের পক্ষে কথা বলত তবে কালো রক্ত বলে কথা যা কখনোই লাল রক্তের সাথে মিশবে না।তাই নতুন প্রজন্মদের মাঝে এক ধরনের ভয় কাজ করছে, রাজাকাররা না হয় ফাসিতে ঝুললো কিন্তু তাদের সন্তানরা!তারাতো কোন একদিন তাদের অপরাধের কথা ভূলে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করবে পিতা বিয়োগের  প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে।তাই ভাবতে হবে রাজাকারদের সন্তানদের নিয়েও, তাদের আইনের আওতায় বন্দী করতে হবে যাতে তারা রাষ্ট্রের কোন গুরুত্ত্বপূর্ণ পদগুলিতে অধিষ্ঠিত হতে না পারে।

অনেক তাল বাহানার পর মুজাহিদীর ফাসির রায় কার্যকর বহাল রইল তাতে সাধারন জনতা একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেলেন।তবে তাদের মরন কামর হরতাল নামক প্রায় অকেজু হওয়া কর্মসূচীটি দিলেন।আবারও হিংস্র হরতাল।মুজাহীদের ফাসির রায় বহালে দেশে বিভিন্ন সামাজিক সংঘটনগুলো শহরে সভা সমাবেশ করে সরকারকে এক প্রকার চাপে রাখেন ।সে রকম একটি সভা সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন সূর্য্যের বন্ধুরা।সেই সমাবেশে আসছিলেন সমর মাঝ পথে তার পথ আটকায় কিছু অচেনা টুপি ওয়ালা তরুন।
-কি রে মালাউন কই যাস?তোদের নাস্তিকদের কাছে?তবে শোন,তোদের মতো কত আকাডাগোরে আমাগো বাপ দাদারা নাকানি চোবানি দিয়েছে আমরাও তোদের ছাড়বো না তবে সময় এলেই টের পাবি,বুঝলি?
-কি যা বলছেন,আর আপনারা কারা?আমিতো আপনাদের কাউকেই চিনি না।
তাদের মাঝ খান থেকে একজন তেরে এসে একেবারে সমরের মুখের সামনে মুখ রেখে বলল।
-চিনবি,সময় হলে চিনিয়ে দেবো,একেবারে চিরকালের জন্য।আর কতকাল তোরা ক্ষমতায় থাকবি,বল এক দিনতো সিংহাসন ছাড়তেই হবে তখন দেখবো কে কাকে বাচায়।
আরেক জন টুপি খোলে মাথার জট চুল গুলো পাকাতে পাকাতে হঠাৎ সমরকে চমকে দিতে মিছেমিছি বন্দুক বের করার অভিনয় করে যা বললো তাতে সমরকে জীবন সম্পর্কে ভীষন ভাবিয়ে তুলল।
-সালারে দিমুনি এহানেই হালাইয়া,,,,,লম্প যম্প কম দিস…দেখতেইতো পারছিস তগো মুক্তমনাগো কি ভাবে একে কোরবানী করতাছি,বিশেষ ভাবে চিন্তা কর তোদেরই দল ক্ষমতায় তারপরেও আমরাই শক্তিশালী,আর যদি ক্ষমতা চলে যায় তখন কি হবেরে চান্দু….কি হবে…যা যা ভালয় ভালয় কেটে পর।

একা ছিল বলে নিজেকে অসহায় লাগছিল।যাবার সুযোগ পেয়ে সে দ্রুত চলে আসেন তাদের সমাবেশে।তাকে দেখে সূর্য্য প্রশ্ন করেন।
-কি রে এতো দেরী করলি কেনো?
সমরের চোখের জল টলটল করছে মুখে তার উত্তর দেয়ার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন।আবারো সূর্যের প্রশ্ন…
-কি রে কথা বলছিস না কেনো?কি হয়েছে?
নিজেকে স্বাভাবিক করতে কিছুটা সময় নেন সমর তারপর কতগুলো প্রশ্ন করেন সূর্য্যকে ।
-বলতো আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কি?এক দিকে রাজাকার বংশধরদের হুমকি খুন অন্য দিকে প্রতিবাদ করলে পুলিশের লাঠি চার্য।শুধু কি আমাদেরই দায়ীত্ত! রাষ্ট্র কিংবা দেশের আর কারো দায়ীত্ত নেই?
-কি হয়েছে খোলে বলবিতো?
-কি আর হবে,চিঠিতে হুমকি দেয় তোকে আজ আসার পথে কাকরাইলের মোড়ে আমাকে কয়েক জন টুপিওয়ালারা শাসালো।ভাগ্যিস ওরা আমাকে মেরে হাত পা ভাঙ্গেনি,
-এই….সভা বন্ধ কর….চল দেখি…..।
jhkhkhসভা অনিবার্য কারনে সংক্ষিপ্ত হওয়ায় আমরা দুঃখিত বলে প্রায় দুই তিনশ জন কাকরাইলের অভিমুখে পায়ে হেটে শ্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছেন।একটি রাস্তায় পুলিশের ব্যারিকেট ছিল তা ভেঙ্গে কিছু দূর যেতেই হঠাৎ পুলিশের লাঠি চার্য আর কাদানে গ্যাসে মিছিলটিও ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায়।পুলিশের মাঝে এক অফিসার তাদের ওয়্যালেসে কথা বলছেন এক উর্ধতন কর্মকর্তার সাথে।অপর প্রান্তের কথার উত্তর দিচ্ছিলেন পুলিশ অফিসারটি।
-উপায় নেই স্যার,ওরা যে ভাবে আইন অমান্য করে রাস্তার ব্যারিকেট ভেঙ্গে যাচ্ছিল তাতে বাধ্য হয়েছি।
-তুমি কি জানো ওরা ক্ষমতাশালীদের লোক,ওরা রাজাকারের ফাসির দাবীতে আন্দোলন করছে।
-জানি স্যার,
-তবে কেনো এমন এ্যাকসানে গেলে?তোমাদের জন্য আমাকে অনেক কথা শুনতে হবে জবাব দিহীতা করতে হবে চার আনার এমপি মন্ত্রীদের কাছে ওভার…বলে কথা বন্ধ করলেন।
এরই মাঝে এক সহকারী অফিস্যারের ওয়্যারলেস আসে।
-হেলো….স্যার মিছিলটি আবারো সক্রিয় হচ্ছে।
-তাহলে এবার জল কামান চালাও….. সাথে রাবার বুলেট।ওভার….।

xgxgxমুহুর্তে ফের দাড়ানো মিছিলটির উপর পুলিশের আরো এক বার হামলা হলো।ঝর্নার ন্যায় অনবরত রাবার বুলেটের পাশাপাশি আসল বুলেটও ছাড়তে ভূল করেননি কোন এক রাজাকার সাপোর্টের পুলিশ।মুহুর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করছে তর তাজা একটি প্রান।স্তব্ধ হয়ে যায় জন চঞ্চল ময় শহর।সমর অভি সূর্য্য কে কোথায় কেউ কাউকে দেখছেন না হয়তো যে যেদিকে পেরেছেন জান বাচা ফরজ করেছেন।পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সূর্য্য অভি একত্রিত হলেও সমর আর স্বর্নাকে দেখতে পারছেন না কোথাও।অভি ওদের দু’জনের মোবাইলে রিং করে স্বর্নাকে মোবাইলে পেলেও সমরকে পেলেন না।
-হ্যালো,স্বর্না তুমি এখন কোথায়।
উত্তর শুনার আগেই লাইনটি কেটে যায়।আবারও রিং ঢুকানোর চেষ্টা স্বর্নার মোবাইলে….মোবাইল বিজি দেখাচ্ছে।অভির মনে হচ্ছিল রাগে মোবাইলটারে ভেঙ্গে ফেলেন।কিন্তু উপায় কি এই একটি মাধ্যমই বিপদে দ্রুত স্বজনদের খোজ নেয়া যায়।সে আবারও রিং দেন স্বর্নাকে।রিংটি রিসিভ হওয়াতে স্বস্তিতে নিঃস্বাস ফেলেন অভি।
-হ্যালো,হ্যা আমি অভি,,,তুমি কোথায়?সমরকে..তো ফোনে পাচ্ছিনা।
কেদে ফেলেন স্বর্না,কান্নার স্রোতের তীব্রতায় ঠিক মত কথা বলতে পারছেন না সে।
-আমি…আমি হাসপাতালে…সমর অপারেসন রুমে।রাবার বুলেটে তার বুক পিঠ ঝাঝরা হয়ে গেছে।
ফোনে কথার মাঝে সূর্য্য অভির কাছ হতে বার বার জানার চেষ্টা করছে কি হয়েছে,সমর স্বর্নারা এখন কোথায় কেমন আছেন।অভি কোন কথা না বলেই কামন…ফলো মি হাসপাতাল যেতে হবে বলে দ্রুত একটি সি এন জি নিয়ে প্রস্থান নেন।

চলবে,

 (y) কোন হ-য-ব-র-ল নয় চাই সামাজিক ও রাষ্টীয় ভাবে সমূলে রাজাকারদের বয়কট  এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোকে  রাজাকার কে রাজাকার বলাতে বাধ্য করতে হবে।

প্রজন্মের ঋণ শোধ ২৩ তম পর্ব পড়ুন
ছবি:সংগৃহীত অনলাইন।

মুজাহীদের অপরাধ সম্পকিত একটি ভিডিও

132px-কাদেরিয়া_বাহিনীর_অস্ত্র_জমাদানকেউ আসুক আর নাই আসুক
আমি আসবো,
প্রিয়তমার ডাকে যেমন করে
ছুটে যেতাম
শত বাধা ডিঙ্গিয়ে
তেমনি করে আমি আসবো,
কখনো মৌনতায় কখনো বা
বজ্র কন্ঠে
রাজ পথে,
শহর গ্রামের অলি গলিতে
আমি আসবো তোমাদের কথা বলতে,
আমি আসবো
আমার অধিকার চাইতে।

আমি আসবো শত
অত্যাচারিত
নীপিরিত
জনতার কাতারে
শোষকের বিরুদ্ধে,
আমি হুংকার তুলবোই
আমি আসবোই তোমাদের মাঝে
হাতে হাত রেখে কাধে কাধ মিলিয়ে
রাজাকার,
আলবদর
শামস্
মানুষ নামক হায়নাদের
বংশ,নিরবংশ করতে
দাবী পেশে
নতুবা
হাতে তুলে নিবো পূর্ব পূরুষদের মতো
আরো একটি যুদ্ধের অস্ত্র
এ যুদ্ধ কোন ভিনদেশের নয়
স্বগোত্রীর
বেকে যাওয়া কিছু জাতির
মগজ ধোলাইয়ে
আমি আসবো
তোমাদের
সাথে।

আমি আসবো তোমাদের মাঝে
দুঃখির দুঃখ
ছিন্নমুল মানুষের
অধিকার আদায়ে
আমি বলব উচ্চ সূরে
আমি শুনতে,
শুনাতে বাধ্য করব
গাও সবাই সাম্যের গান
কেউ খাবেতো কেউ খাবে না
কেউ অট্রেলিকায় আরাম করবে
কেউ শুধু
মাথাগুজবার ঠাইটুকুও পাবে না
তা আর হবে না
হতে দিবো না,
প্রয়োজনে
হাজারো
লাশ
হবো
শাসকের বুলেটে সিনা টান করে
দাড়াবো
তবুও
তোমাদের
আত্তার সংগ্রামী বন্ধন ছাড়বো না।
আমি আসবো
আমাকে আসতেই হবে
স্বাধীনের চৌয়াল্লিশটি বছর
নীরবে কেদেছিঁ
কত মা’দের অকালে
পুত্র হারানোর শোক
দেখেছি
শুধু
মুক্তমনা বলে ওরা পশুর মতো
প্রতিভাময় মানুষগুলোকে
অমানুষেরা দাড়ালো অস্ত্রের আঘাতে
জনসম্মুখে,
অন্ধ প্রশাসনের সামনেই
তিলে তিলে কূপিয়ে
খুন করল
রাষ্ট্র
তদন্ত
ফদন্ত
নামে
অদৃশ্য
শক্তির
বলে
ষোল কোটি আমজনতাকে উপহাস করল,
ওরা শাসক নয় ওরা অর্থের পাগল
বিকলাঙ্গ প্রশাসন
ভেঙ্গে দিতে
আমি
আসবো
তোমাদের মাঝে
তোমাদের সুখ দুঃখে ভাগ নিতে
প্রয়োজনে যুদ্ধের ডাক দিবো
এবারের সংগ্রাম
“চাই
স্বাভাবিক
মৃত্যুর
গ্যারান্টি”
জয়
আমাদের
নিশ্চিত।

CYMERA_20150526_091214TMP_imgশ্যামলে সবুজে স্বদেশ
রূপের নেইকো শেষ
সব ধর্মের একত্রে বস বাস
আমাদের এই বাংলাদেশ।
এই মাটি আমার অহংকার
জীবন রাঙ্গানো অলংকার
এক বাক্যে কায়ো মনে জপি
তুমিই আমর স্বদেশ।

জন্মেছি তোমার কোলে
কাদামাটি এক করে খেলেছি কত খেলা
2015_06_01_01_14_4914299056553531ঝিলের জলে শাপলা কূড়তে
গত হতো যে কত বেলা।
ঘুড়িয়েছি বহু দেশ দেশান্তর
খুজে পাইনি কভূ মৃত্তিকা
এমন তাজাঁ ফসলের উর্বরতা
অনাদরে,
কেমন করে বেড়ে উঠে
গাছ গাছালি লতা-পাতা।
নদী মাতৃক দেশ আমার
বৈঠা চালিয়ে মাঝি,
ভাওয়াই পল্লীগীতির সূর তুলে
গলা ছেড়ে গেয়ে সে
কত কিছুই যে এপাড় ও পাড় করায়।
2015-05-29_16-54-06-154PicsArt_1431281055643
কত কবি কত সাহিত্যিক মুগ্ধ
তার রূপে
ষড় ঋতুতে স্বদেশের প্রকৃতি
ভিন্ন ভিন্ন সাজে।
শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় মন নেচে যায়
বাহারী পিঠা আর ফলোৎসবে
বাঙ্গালী অতিথী আপ্যায়নে
গ্রাম শহর এক হয়ে যায়।
2015-05-29_17-44-45-0532015-05-29_18-00-11-290 মেলায় যাইরে পাগল করা উৎসবে
ছেলে বুড়ো সবাই মিলে
জীবনকে রঙ্গীন করে বেড়ায়
নাগর দোলায় দোল খায় দেহ-মনে।
হরেক রকম কসমেটিসে সাজেঁ
শহর-পল্লী বধু কন্যা,
অর্থের টান পোড়নেও বাধ মানেনা
উৎসবের আমেজে ঘরে
অতিথীর ঠাই ধরে না।
CYMERA_20150612_152402
PHOTO_20150612_175543_PAST_SHOT_00
কাবাডি আর ফুটবল খেলা চলে
হরদম বার মাসে
পাড়া মহল্লা মেতে উঠে
আছে আমাদের  ক্রীকেটার টাইগার
আধুনিক বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ দেবার
আমরাও কম কিসে।
এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে 
আমার জন্ম ভূমি।
2015-04-27_00_13_46

সোনেলা ব্লগের সহ ব্লগার

সাতকাহন হতে নেয়া

সুভাষ বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তাঁর বাবার কর্মস্থল উড়িষ্যার কটক শহরে। বাবা জানকীনাথ বসু, মা প্রভাবতী দেবী। সুভাষ বসু ছিলেন বাবা-মায়ের নবম সন্তান। সুভাষদের পৈতৃক নিবাস পশ্চিম বাঙলার চব্বিশ পরগণার চাংড়িপোতা গ্রামে। সুভাষ পূর্ব-পুরুষের দিক দিয়ে দুইটি ভূস্বামী গোষ্ঠীর উত্তরসূরী ছিলেন, পৈতৃকসূত্রে মাহিনগরের বসু পরিবারের আর মায়ের দিক দিয়ে হাটখোলার দত্ত পরিবারের। সুভাষের বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী, তিনি কটক শহরের স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন। আর বাবা জানকীনাথ বসুর আইন ব্যবসার সূত্রেই সুভাষদের বসতি উড়িষ্যার কটক শহরে।

অন্যদিকে সুভাষের বাবা এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তিনি ১৯০১ সালে কটক শহরের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। জানকীনাথ বসু ১৯০৫ সালে কটক শহরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিযুক্ত হন, কিন্তু ওই সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বিবাদ সৃষ্টির কারণে ১৯১৭ সালে জানকীনাথ বসু পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯১২ সালে জানকীনাথ বসু বেঙ্গল লেজিজলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময়ই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায় বাহাদুর খেতাবে ভূষিত করে। সুভাষের আইসিএস থেকে পদত্যাগে তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন, তবে পরবর্তীকালে সুভাষের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি খুবই গৌরববোধ করেছিলেন সুভাষের মতো সন্তানের পিতা হতে পেরে। ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া রায় বাহাদুর খেতাব বর্জন করেন জানকীনাথ বসু।

সুভাষের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় কটক শহরের র‌্যাভেন’শ কলেজিয়েট স্কুলে। প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী বেণীমাধব দাস। বেণীমাধব ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং আদর্শবান একজন শিক্ষক। ছাত্রদের দেশপ্রেমিক ও আদর্শ চরিত্র গঠন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধকরণে বিপ্লবী বেণীমাধব দাসের অবদান ছিলো অপরিসীম। সুভাষ বসুর জীবনে মূলত এই বিপ্লবীর প্রচ্ছন্ন ছায়া শেষদিন পর্যন্ত ছিলো।

সুভাষ ১৯১১ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজে ওটেন সাহেব নামে একজন ইংরেজ অধ্যাপক ভারত বিরোধীতায় মুখর হয়ে উঠতেন শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময়। এই কারণে ওটেন সাহেব বিপ্লবী অনঙ্গমোহন, বিপ্লবী সতীশ দে ও সুভাষ বসুর দ্বারা প্রহৃত হন। এই অপরাধে ১৯১৬ সালে অন্যদের সাথে সুভাষ বসুকেও কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়।

এরপর কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে কাটানোর পর ১৯১৭ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় সুভাষ স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯১৯ সালে দর্শন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই সময় সুভাষ ইউনির্ভাসিটি অফিসার্স কোর-এ যোগ দিয়ে সমরবিদ্যায় জ্ঞান অর্জন করেন।

বাবা জানকীনাথ বসু ও পরিবারের সিদ্ধান্তে আইসিএস পড়ায় মনস্থির করলেন সুভাষ। ১৯১৯ সালের শেষের দিকে আইসিএস পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান সুভাষ। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই চতুর্থস্থান অর্জন করে আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সুভাষ। ১৯২১ সালে ক্যামব্রিজ থেকে গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করেন সুভাষ।

সুভাষের বাল্যকাল ও কৈশোর কেটেছে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশে। এই আন্দোলন সারা ভারতবর্ষেও রাজনৈতিক অঙ্গন প্রকম্পিত করে তুলেছিলো। স্কুলে যখন পড়তেন তখন সুভাষ বিপ্লবী গুরু অরবিন্দ ঘোষকে দেখেছিলেন বিপ্লবী প্রচেষ্টায় অক্লান্ত পরিশ্রম করতে। দেখেছিলেন প্রফুল্ল চাকী ও প্রফুল্ল চক্রবর্তীর আত্মাহুতি; ক্ষুদিরাম বসু, কানাই লাল দত্ত, সত্যেন বসু, চারু বসু, বীরেন দত্তগুপ্তকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে দেখেছেন। কলেজে পড়াকালী সময়ে দেখেছেন প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতা রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে দিল্লীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর উপর বোমা নিক্ষেপ করতে, সেই রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বেই দেখেছেন ভারতবর্ষে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ সংঘটিত করতে; দেখেছেন বিপ্লবী বাঘা যতীনকে তাঁর চার সহকর্মী চিত্তপ্রিয় চৌধুরী, নীরেন দাশগুপ্ত, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং যতীশ পালসহ ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে শহীদ হতে।

১৯১৯ সালে সুভাষ যখন আইসিএস পড়তে গেলেন ইংল্যান্ডে, তারপরই জালিওয়ালানবাগের পাশবিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। ১৩ এপ্রিলের ওই হত্যাকাণ্ডে দুই হাজারের বেশি নিরস্ত্র মানুষ হতাহত হয়েছিলো। সারা ভারতবর্ষ তখন প্রতিবাদে ও নিন্দায় সরব হয়ে উঠেছিলো, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাইট উপাধি বর্জন করেছিলেন ওই ঘটনার পরে। ওই ঘটনা প্রতিবাদী সুভাষকে প্রবলভাবে ব্যথিত করে তুলেছিলো। সেই সময় সারা ভারতবর্ষে যেভাবে ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি সুভাষ যে বিপ্লবের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ প্রত্যক্ষ করেছেন তা তাঁর বিপ্লবী মনের উপর প্রচণ্ডভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তখন ভারতবর্ষে দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবোধের যে উন্মেষ ঘটেছিলো তা তিনি অবলোকন করেছেন, উপলব্ধি ও আত্মস্থ করেছেন। ওই ঘটনাগুলোর মাধ্যমেই তিনি দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের সাথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেলেন; যা পরে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর প্রচণ্ডভাবে প্রভাব ফেলে। ইংল্যান্ডে থাকাকালে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি সেখানকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানগুলো অবলোকন করেন এবং ইউরোপ সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেন।

১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী কর্তৃক যখন ভারতবর্ষব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছিলো ঠিক সেই সময় জাতীয়তাবোধে সিক্ত, বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী সুভাষ বসুর মন চলে গেলো ভারতের রাজনীতির মাঠে। সুভাষ আইসিএস-এর লোভনীয় চাকুরি ও বিলাসবহুল জীবন পরিত্যাগ করে বিপ্লবের টানে ও মুক্তির তাড়নায় স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য মনস্থির করলেন।

১৯২১ সালের ২২ এপ্রিল সুভাষ আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ভারতে ফিরে আসেন। ১৩ জুলাই বোম্বে পৌঁছে তিনি সোজা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান। গান্ধী তাঁকে উৎসাহ দিয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে দেখা করতে বলেন। কোলকাতায় ফিরে সুভাষ দেখা করলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে; সুভাষ দেশবন্ধুর সাথে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এই সময় থেকেই দেশবন্ধু তাঁকে রাজনৈতিক শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯২১ সালের আগস্ট মাসে সুভাষ বসু অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। চৌরিচেরার সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গান্ধী সেইবারের মতো আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে সুভাষও গান্ধীর এমন কর্মকাণ্ডে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ওই বছরেই সুভাষ ব্রিটেনের যুবরাজের ভারত ভ্রমণ বয়কট আন্দোলনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ওই বয়কট আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে সুভাষকে গ্রেফতার করা হয়।

বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুভাষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। সুভাষ দেশবন্ধুর আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে কোলকাতা কংগ্রেস-এর কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নেন। সুভাষকে জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষ, প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির পাবলিসিটি বোর্ডের ও স্বরাজ পত্রিকা এবং জাতীয় ভলান্টিয়ার গ্রুপের দায়িত্ব দেওয়া হলো। একজন অনভিজ্ঞ লোকের হাতে এতো দায়িত্ব দেয়ার জন্য অনেকের ঈর্ষার কারণ ও সমালোচিত হয়েছিলেন দেশবন্ধু। কিন্তু সুভাষ বসু একজন অভিজ্ঞ লোকের মতো তাঁর সমস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তাঁর রাজনৈতিক গুরুকে সঠিক প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। এ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সম্পাদিত কোলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকা তাঁর উদ্যম আর কর্মক্ষমতার প্রশংসা করে বলেছিলো, ‘যখন কংগ্রেস একজন সামর্থ লোক পেলো, তখন সরকার হারালো তার একজন সুদক্ষ কর্মকর্তা।’[১]

১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে উত্তরবঙ্গে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো সেখানে বন্যাপীড়িতদের সেবা করে মানবতার যে স্বাক্ষর রেখেছিলেন সুভাষ, তা তাঁর ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য সহায়ক হয়েছিলো।

সুুভাষ বসু বিশ্বাস করতেন যে, আবেদন-নিবেদন ও তোষামোদ করে স্বাধীনতা আদায় করা সম্ভব না,স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয় সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে, রক্তের বিনিময়ে। তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই কংগ্রেসের পাশাপাশি বাঙলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগঠিত করতে থাকেন। এই সময় থেকেই তিনি একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে অপরদিকে বাঙলার বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। বিপ্লবীগণও তাঁকে নিজেদের নেতারূপে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সুভাষ কোলকাতা ও ঢাকাসহ বাঙলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্কের স্থাপন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলনের নিবেদিতপ্রাণ সমন্বয়কারী। দেশবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙলাকে অখণ্ড রেখে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করতে হলে হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার প্রয়োজন, প্রয়োজন একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের। তাই ১৯২৩ সালে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক সম্মেলনে দেশবন্ধু তাঁর বিখ্যাত হিন্দু-মুসলিম চুক্তি (বেঙ্গল প্যাক্ট) সম্পাদন করেন। এই চুক্তিতে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠার শর্ত নিবদ্ধ ছিলো। এই চুক্তিতে ছিলো আইনসভাগুলোতে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ এবং চাকুরির সংখ্যানুপাতিক বিন্যাস, এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের শতকরা ৫৫ ভাগ এবং হিন্দুদের শতকরা ৪৫ ভাগ নির্ধারণ হয়। এই চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করা চলবে না এবং মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসনের জন্য গো-হত্যা হলে তাতে বাঁধা দেয়া চলবে না। হিন্দুদের মনে আঘাত লাগে এমন স্থানে গো-হত্যা করা চলবে না।[২]

এই চুক্তিটি তৈরি করেন সুভাষ বসু। এরই মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মতিলাল নেহেরুর সাথে ‘স্বরাজ্য দল’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, সুভাষ বসুর সাংগঠনিক নেতৃত্বে যা ভারতবর্ষে একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে অবস্থান লাভ করে।

তথ্যপঞ্জি :   
১.    দি স্টেটসম্যান, কোলকাতা; ২০ ডিসেম্বর ১৯২১
২.    বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তির খসড়া, ১৯২৩

১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সুভাষ বসু তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পাশে থেকে তাঁর সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষ ছিলেন দেশবন্ধুর যোগ্য উত্তসূরী।

সুভাষ ১৯২১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই পুরো ভারতবর্ষে বিভিন্ন যুব সংগঠনের সভা-সমিতিতে যোগ দিয়ে তাদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। ১৯২২ সালের মে মাসে তরুণদের স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিফলেট আকারে প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি লেখেন:

‘আমরা এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি একটা উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে, একটা বাণীর জন্য। আলোক জগৎ উদ্ভাসিত করিবার জন্য যদি গগনে সূর্য উদিত হয়, গন্ধ বিতরণের উদ্দেশে, বনমধ্যে কুসুমরাজি যদি বিকশিত হয়, অমৃতময় বারিদান করিতে, তটিনী যদি সাগরভিমুখে প্রবাহিত হয়, যৌবনের পূর্ণ আনন্দ ও ভরা প্রাণ লইয়া আমরাও মর্ত্যলোকে নামিয়াছি একটা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, স্বাধীনতা।

এই দুঃখসঙ্কুল, বেদনাপূর্ণ নরলোকে আমরা আনন্দ-সাগরের বান ডাকিয়া আনিবো। আশা, উৎসাহ, ত্যাগ ও বীর্য লইয়া আমরা আসিয়াছি। আমরা আসিয়াছি সৃষ্টি করিতে কারণ, সৃষ্টির মধ্যেই আনন্দ। তনু, মন-প্রাণ, বুুদ্ধি ঢালিয়া দিয়া আমরা সৃষ্টি করিবো। নিজের মধ্যে যাহা কিছু সত্য, যাহা কিছু শিব আছে-তাহা আমরা সৃষ্ট পদার্থের মধ্যে ফুটাইয়া তুলিবো। আত্মদানের মধ্যে যে আনন্দে আমরা বিভোর হইবো, সেই আনন্দের আস্বাদ পাইয়া পৃথিবীও ধন্য হইবে।

আমরাই দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করিয়া থাকি। আমরা শান্তির জল ছিটাইতে এখানে আসি নাই। বিবাদ সৃষ্টি করিতে, সংগ্রামের সংবাদ দিতে, প্রলয়ের সূচনা করিতে আমরা আসিয়া থাকি। যেখানেই বন্ধন সেখানেই গোঁড়ামি, যেখানেই কুসংস্কার সেখানেই সঙ্কীর্ণতা-সেখানেই আমরা কুঠার হস্তে উপস্থিত হইবো।

আজ পৃথিবীর সকল দেশে বিশেষত, যেখানে বার্ধক্যের শীতল ছায়া দেখা দিয়াছে, তরুণ সম্প্রদায় মাথা তুলিয়া প্রকৃতস্থ হইয়া সেখানে দণ্ডায়মান হইয়াছে। কোন দিব্য আলোকে পৃথিবীকে তাহারা উদ্ভাসিত করিবে তাহা কে বলিতে পারে…! ওগো আমার তরুণ জীবনের দল তোমরা ওঠো, জাগো, ঊষার কিরণ যে দেখা দিয়াছে।’[৩]

১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসে আর্যসমাজ হলে নিখিল বঙ্গ যুব সম্মিলনীর অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণে সুভাষ ভরাট কণ্ঠে বলেন:

‘যেখানে জীবনের লীলাখেলার আনন্দের লুট হতো, যেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উৎসগুলির প্রাচুর্য্যে আমাদের ভাণ্ডার উপচে পড়তো, যেখানে জলে সুধা, ফলে অমৃত, শস্যে দেশের অনন্ত প্রাণদায়িনী শক্তি ছিলো, সেখানে আজ বিরাট শ্মশান খাঁ খাঁ করছে। প্রেতের ছায়া দেখে অর্ধমৃত প্রাণ শিউড়ে উঠেছে। এক বিন্দু জল নেই, এতোটুকু জীবন নেই। তোমরা জাগো ভাই, মায়ের পূঁজো শঙ্খ বেজেছে, আর তোমরা তুচ্ছ দীনতা নিয়ে ঘরের কোণে বসে থেকো না। এমন সুন্দর দেশ, এমন আলো, এমন বাতাস, এমন গান, এমন প্রাণ, আজ মা সত্যিই বুঝি ডেকেছেন। ভাই, একবার ধ্যাননেত্রে চেয়ে দেখো, চারদিকে ধ্বংসের স্তুপীভূত ভষ্মরাশির ওপর এক জ্যোতির্ময়ী মূর্তি। কী বিরাট! কী মহিমায়! শ্যামায়মান বনশ্রীতে নিবিড় কুন্তলা, নীলাম্বর-পরিধানা, বরাভয়বিধায়িনী, সর্বাঙ্গীন, সদা হাস্যময়ী, সেই তো আমার জননী।

সেখানে রাজনৈতিক মতদ্বৈধের কোনো স্থান নেই। সমাজ পদ্ধতির কোনো বিশিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানকে গোঁড়ামির দ্বারা বড় করে দেখা হবে না। বিভিন্ন ধর্মের পার্থক্য কোনো বাঁধা সৃষ্টি করবে না। সেখানে সমস্ত দেশবাসী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একই আদর্শে বিশ্বাসী, একই লক্ষ্যে, একই পথে আপন মনুষ্যত্বকে পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করে আমরণ চলতে থাকবে।

অন্তর থেকে কর্মশক্তি আমাদের উদ্বুব্ধ করবে, যে নৈতিক বল আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চালিত করবে সেই শক্তি, সেই বলকে আহুতির অগ্নির মতো চিরন্তনের জন্য উদ্দীপ্ত রাখতে হবে। আশা চাই, উৎসাহ চাই, সহানুভূতি চাই, প্রেম চাই, অনুকম্পা চাই, সবার উপরে মানুষ হওয়া চাই। মানুষের মধ্যে দেবতার প্রতিষ্ঠাই আমাদের সাধনা। জীবনব্যাপী এই সাধনার মধেই আমাদের মুক্তি নিহিত।’[৪]

১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে সুভাষের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এই প্রবন্ধে সুভাষ লেখেন:

‘দেড়শত বৎসর পূর্বে বাঙালি বিদেশিকে ভারতের বক্ষে প্রবেশের পথ দেখিয়েছিলো। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত বিংশ শতাব্দীর বাঙালিকে করতে হবে। বাঙলার নর-নারীকে ভারতের লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। কি উপায়ে এই কার্য সু-সম্পন্ন হতে পারে এটাই বাঙলার সর্বপ্রধান সমস্যা। বাঙালি জাতীয় জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রে অগ্রণী না হলেও আমার স্থির বিশ্বাস যে, স্বরাজ সংগ্রামে বাঙলার স্থান সর্বাগ্রে। আমার মনের মধ্যেও কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতবর্ষে স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং স্বরাজ প্রতিষ্ঠার গুরুভার প্রধানত বাঙালিকেই বহন করিতে হইবে। অনেকে দুঃখ করে থাকেন, বাঙালি মাড়োয়ারি বা ভাটিয়া হলো না কেনো? আমি কিন্তু প্রার্থনা করি বাঙালি যেনো চিরকাল বাঙালিই থাকে। বাঙালিকে এই কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, শুধু ভারতবর্ষ কেনো সারা পৃথিবীতে তার একটি স্থান আছে-এবং সেই স্থানের উপযোগী কর্তব্যও তার সামনে পড়ে রয়েছে। বাঙালিকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, আর স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভারত গড়ে তুলতে হবে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীত, শিল্পকলা, শৌর্য-বীর্য, ক্রীড়া-নৈপুণ্য, দয়া-দাক্ষিণ্য-এই সবের ভিতর দিয়ে বাঙালিকে নতুন ভারত সৃষ্টি করতে হবে। জাতীয় জীবনের সর্বাঙ্গীন উন্নতি বিধান করবার শক্তি এবং জাতীয় শিক্ষার সমস্বয় করবার প্রবৃত্তি একমাত্র বাঙালিরই আছে।

গত দুই তিন বৎসর ধরে বাংলাদেশে যে জাগরণের বন্যা এসেছিলো সে বন্যা এখন ভাঁটার দিকে চলেছে বটে, কিন্তু জোয়ারের আর বেশি বিলম্ব নাই। বাংলাদেশে জাতীয়তার স্রোতে আবার প্রবল বন্যা আসবে। সে বন্যার স্পর্শে বাঙলার প্রাণ আবার জেগে উঠবে। বাঙালি সর্বস্ব পণ করে আবার স্বাধীনতার জন্য পাগল হয়ে উঠবে, দেশ আবার স্বাধীনতা লাভের জন্য বদ্ধপরিকর হবে।

ভাই, তোমরা সকলে কি আত্মবলির জন্য প্রস্তুত আছো? এসো, হে আমার তরুণ জীবনের দল, তোমরাই তো দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করেছো। আজ এই বিশ্বব্যাপী জাগরণের দিনে স্বাধীনতার বাণী যখন চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে তখন কি তোমরা ঘুমিয়েই থাকবে?

ওগো বাঙলার যুব সম্প্রদায়, স্বদেশ সেবার পূণ্যযজ্ঞে আজ আমি তোমাদের আহ্বান করছি। তোমরা যে যেখানে যে অবস্থায় আছো, ছুটে এসো। চারিদিকে বাঙলা মায়ের মঙ্গল শঙ্খ বেজে উঠেছে।’[৫]

১৯২৪ সালে কোলকাতা পৌর কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরেই তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকতা নিয়োগ দিবেন। এই পদে থেকে বাঙলার বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা সহজ হবে ভেবেই দেশবন্ধু প্রধান নির্বাহী পদে সুভাষ বসুকে নিয়োগ প্রধান করেন।

কর্পোরেশনের দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮১৮ সালের ৩নং ধারার বলে ১৯২৪ সালের অক্টোবর মাসে সুভাষকে বন্দি করা হয়। পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের নথিপত্র থেকে জানা যায়:

‘১৯২৪ সালে স্বরাজ্য দলের বিপ্লবী সদস্যগণ কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী পদের জন্য সুভাষ বসুকে সমর্থন করেছিলেন এবং এটা লক্ষ্যণীয় যে, তাঁর ওই পদের নিয়োগের পর কর্পোরেশনে অগণিত বিপ্লবীদের চাকুরি দেয়া হয়েছিলো। এই সময় সুভাষ বসু ও বিপ্লবীদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিলো যে, সুভাষ তাঁর নির্দেশ মতো বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস পরিচালনা করবেন।’[৬]

বিপ্লবীদের সঙ্গে সুভাষের এই ঘনিষ্ঠতার কিভাবে সেদিন পুলিশের পক্ষে জানা সম্ভব হয়েছিলো তাও পুলিশের গোপন নথিতে উল্লেখ করা আছে:

‘১৯২৪ সালের প্রথম দিকে কংগ্রেসের একজন বিখ্যাত নেতা জনৈক উচ্চপদস্থ এক সরকারি কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেছিলেন যে, বাংলাদেশে একটি বৈপ্লবিক আন্দোলনের অস্তিত্ব আছে, যারা স্বরাজ্য দলের মুখোশ পড়ে রয়েছেন। ওই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের পুরো নিয়ন্ত্রণ করছেন সুভাষ বসু।’[৭]

এর পূর্বেই ১৯২৩ সালে বিখ্যাত বিপ্লবী হরিকুমার চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ ও ভূপেন্দ্র কুমার দত্তসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে একই কারণে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় আটককৃত অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে সুভাষ বসুকে বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) মান্দালয় জেলে প্রেরণ করা হয়।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সুভাষ বসু ও অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবিতে তাঁর বাড়িতে নিখিল ভারত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একটি সভা আহ্বান করেন। এই সভায় দেশবন্ধু তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন:

‘If love of country is crime, i am a criminal. If Mr. Subhas Chndra Bose is criminal, i am a criminal, not only the chief executive officer of the corporation, but the mayor of this corporation is equally guilty.’[৮]

তথ্যপঞ্জি:

৩.    যুবকদের প্রতি সুভাষ বসুর লিফলেট, মে ১৯২২
৪.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ ডিসেম্বর ১৯২২
৫.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ ডিসেম্বর ১৯২৪
৬.    ব্রিটিশ পুলিশের গোপন নথি, কোলকাতা ১৯২৪
৭.    ব্রিটিশ পুলিশের গোপন নথি, কোলকাতা ১৯২৪
৮.    নেতাজী সঙ্গ-প্রসঙ্গ, নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা ১৯৭৩

জেলে থাকাকালে ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ তারিখে সুভাষ বসু’র একটি নিবন্ধ ছাপা হয় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে, এই নিবন্ধে সুভাষ জোড়ালো কণ্ঠে বলে উঠেন, ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা:

‘যে জাতির অস্তিত্বের আর সার্থকতা নেই, যে জাতির প্রাণের স্পন্দন একেবারে নিঃশ্বেষ হয়েছে সে জাতি ধরাপৃষ্ঠ থেকে লোপ পায়। অথবা কীটপতঙ্গের মতো কোনো প্রকারে জীবন ধারণ করতে থাকে।

ভারতের একটি বাণী আছে যেটা জগৎসভায় শোনাতে হবে। ভারতের শিক্ষার মাঝে এমন কিছু আছে যা বিশ্বমানবের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এবং যা গ্রহণ না করলে বিশ্ব সভ্যতার প্রকৃত উন্মেষ ঘটবে না। শুধু তাই না, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এসব ক্ষেত্রেও আমাদের জাতি এই জগৎকে কিছু দেবে, কিছু শিখাবে।

দেশান্তরে কারাবাসে মাসের পর মাস যখন কাটিয়েছি তখন প্রায়ই এ প্রশ্ন আমার মনে উঠতো কিসের জন্য, কিসের উদ্দীপনায় আমরা কারাবাসের চাপে ভগ্নপৃষ্ঠ না হয়ে আরো শক্তিমাণ হয়ে উঠছি। নিজের অন্তরে যে উত্তর পেতাম তার মর্ম এই যে, ভারতের একটা মিশন আছে, একটা গৌরবময় ভবিষ্যত আছে। সেই ভবিষ্যত ভারতের উত্তরাধিকারী আমরাই। নতুন ভারতের মুক্তির ইতিহাস আমরাই রচনা করছি এবং করবো। এই শ্রদ্ধা এই আত্মবিশ্বাস যার আছে, সেই ব্যক্তি সৃষ্টিক্ষম, সেই ব্যক্তি দেশসেবার অধিকারী।

অনেকে মনে করেন যে, দুঃখের মধ্যে বুঝি শুধুই কষ্ট আছে, কিন্তু এই কথা সত্য নয়। দুঃখের মধ্যে যেমন কষ্ট আছে, তেমনি দুঃখের মধ্যেও আছে অপার আনন্দ।

নীলকণ্ঠকে আদর্শ করে যে ব্যক্তি বলতে পারে আমার মধ্যে আনন্দের উৎস খুলে গেছে, তাই আমি সংসারের সকল দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা-ক্লেশ মাথায় তুলে নিচ্ছি, কারণ এর ভেতর দিয়ে আমি সত্যের সন্ধান পেয়েছি, সেই ব্যক্তির সাধনাই সিদ্ধ হইয়াছে।’[৯]

১৯২৭ সালে মান্দালয় জেল থেকে লিফলেট আকারে সুভাষের আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে সুভাষ লেখেন:

‘নিজের জীবন পূর্ণরূপে বিকশিত করিয়া ভারত মাতার পদতলে অঞ্জলিস্বরূপ নিবেদন করিবো এবং আন্তরিক উৎসর্গের ভিতর দিয়ে পূর্ণতর জীবন লাভ করিবো, এই আদর্শের দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

আমার এই ক্ষুদ্র অথচ ঘটনাবহূল জীবনে যে সকল ঝড় আমার উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে, বিঘ্ন বিপদের সেই কষ্টিপাথর দ্বারা আমি নিজেকে সূক্ষ্মভাবে চিনিবার ও বুঝিবার সুযোগ পাইয়াছি।

এই নিবিড় পরিচয়ের ফলে আমার প্রত্যয় জন্মিয়াছে যে, যৌবনের প্রভাবে যে কণ্টকময় পথে আমি জীবনের যাত্রা শুরু করিয়াছি, সেই পথে শেষ পর্যন্ত চলিতে পারিবো। অজানা ভবিষ্যতকে সম্মুখে রাখিয়া যে ব্রত একদিন গ্রহণ করিয়াছিলাম তাহা উদযাপন না করিয়া বিরত হইবো না।

আমার সমস্ত প্রাণ ও সারা জীবনের শিক্ষা নিংড়াইয়া আমি সত্য পাইয়াছি, পরাধীন জাতির শিক্ষা-দীক্ষা-কর্ম সকলই ব্যর্থ; যদি তাহা স্বাধীনতা লাভের সহায় বা অনুকূল না হয়। তাই আজ আমার হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ হইতে এই বাণী নিরন্তর আমার কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়?’[১০]

এইসময় মান্দালয় জেলে থাকাকালে আটককৃত বিপ্লবীদের সাথে সুভাষের সম্পর্ক ঘনিষ্ট থেকে ঘনিষ্টতর হয়। ১৯২৫ সালের ১৬ জুন তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা যান। এই বিয়োগান্তক ঘটনায় সুভাষ ভেঙে পড়েন।

জেলে থাকাকালেই ১৯২৬ সালে সুভাষ বেঙ্গল এসেমব্লিতে সদস্য নির্বাচিত হন।  ১৯২৭ সালের মে মাস পর্যন্ত সুভাষ মান্দালয় জেলে বন্দি ছিলেন।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি যুব সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতৃত্বে আসেন এবং ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন থেকেই বাঙলায় কংগ্রেস রাজনীতিতে দুটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়, একটি জে এম সেনগুপ্তের, অন্যটি সুভাষ বসুর। একই সাথে সর্বভারতীয় কংগ্রেসেও সুভাষের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় স্বয়ং গান্ধীর থেকেও বেশি। সেই সাথে সুভাষ যুব সম্প্রদায়ের প্রাণের নেতায় পরিণত হন।

সুভাষ সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ জনতা তাঁকে সংবর্ধনা দিতে থাকেন। এইসব সংবর্ধনা সভায় সুভাষ যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান জানান। ১৯২৮ সালের ১ মার্চ অ্যালবার্ট হলে ছাত্রদের দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুভাষ বলেন:

‘বলা বাহুল্য, স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতবর্ষে যুবকদের সাথে আমি একমত। দেশে যারা আশার পাত্র তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত যে কোন আন্দোলনে আমি তাদের চরণে নিজের জীবন দেবো। তরুণদের উপর আমার আস্থা আছে। আমি সুনিশ্চিত যে এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাফল্যে সঙ্গে তারা উত্তীর্ণ হবেন।’[১১]

১৯২৮ সালের ২ মার্চ মহীশুর পার্ক প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় আগত নারীদের উদ্দেশ্যে সুভাষ জোড় গলায় বলেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা:

‘ভারতবর্ষ একসময় জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বস্ত্র, জ্বালানী, লবণ, তেল উৎপাদনে গৌরবজনক অবস্থানে ছিলো। তখন নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যেতো। এমনকি একশ’ বছর আগেও আমাদের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্প ছিলো।

আমি মায়েদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে, আপনারা ব্রিটিশ পণ্য স্পর্শ করবেন না, এই দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে আরো একবার প্রমাণ করুন যে হাত শিশুর দোলনায় দোল দিয়েছে সেই হাতই বিশ্ব শাসন করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, স্বদেশির শপথ আপনারা যদি রক্ষা করেন তাহলে স্বাধীনতা লাভ করতে দেরি হবে না।’[১২]

১৯২৮ সালের ৪ মার্চ, বাকুড়ায় স্থানীয় নারীদের একটি বিশাল সমাবেশে সুভাষ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে উঠেন ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের কথা, স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথাও বলেন সুভাষ:

‘আমরা বিদেশিদের শোষণের অসহায় শিকার। যদি পৃথিবীর বুক থেকে ভারতীয় জাতিকে বিলুপ্ত হতে না হয়, তাহলে এই অবস্থার অবসান ঘটাতেই হবে। এই রকম জায়গায় নতুনদের কোনোরকম আত্মত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হলে চলবে না। এমন কি, লক্ষ্যবস্তুর অনুসরণ করতে গিয়ে যদি আত্মবিলুপ্তি ঘটে তাও স্বীকার করে নিতে হবে।

আমি আপনাদের কাছে বিদেশি বস্ত্র বয়কটের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি। মহিলারা যদি আন্তরিকভাবে বয়কট আন্দোলনের ভারবহন না করেন তাহলে এই আন্দোলনকে সফল করে তোলার পক্ষে যাদের যোগ্যতা সর্বাধিক তাদেরই সমর্থনের অভাবে আমাদের সকল প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে। আপন সংসারে বাঙালি নারী মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত। তাকে অমান্য করে এমন পুরুষ কোথায়…?’[১৩]

১৯২৮ সালের ৫ মার্চ, বাকুড়ায় পৌরসভা, জেলাবোর্ড ও নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত সকলকে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করতে বলেন সুভাষ। একই দিনে বাকুড়ার অভয় আশ্রমে এক সংবর্ধনা সভায় যুবকদের শারীরিক ও মানসিক গঠন এবং দেশপ্রেমে সিক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

তথ্যপঞ্জি:

৯.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৬
১০.  সুভাষের লিফলেট, মান্দালয় জেল ১৯২৭
১১.  আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মার্চ ১৯২৮
১২.  আমি সুভাষ বলছি, শ্রী শৈলেশ দে, দে’জ পাবলিশার্স; কোলকাতা ১৯৭৩
১৩.  আমি সুভাষ বলছি, শ্রী শৈলেশ দে, দে’জ পাবলিশার্স; কোলকাতা ১৯৭৩

১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে কোলকাতা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেস উপলক্ষ করে সুভাষ সারা বাঙলার বিপ্লবীদের সংগঠিত করেন এবং বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন, সুভাষ নিজেই এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জিওসি’র দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এই বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিলো পদাতিক বাহিনী, নারী বাহিনী, মোটরসাইকেল বাহিনী, এবং মেডিকেল কোর বাহিনী। ওই সময় ১৯২৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় এই বিষয়ে সম্পাদকীয়তে বলা হয়:

‘স্বেচ্ছাসেবকদিগের নিয়মানুবর্তিতা প্রশংসনীয়। শ্রীযুক্ত সুভাষ চন্দ্র বসু সর্বদা উপস্থিত থাকিয়া তাহাদিগকে জাতির সেবায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিতেছেন, এই জন্য শ্রীযুক্ত বসু ধন্যবাদার্হ্য। সায়াহ্নের সঙ্গে সঙ্গে কুচকাওয়াজের মাঠে ঢাক ও বিউগল বাজিয়া ওঠে, উহাতে আসন্ন যুদ্ধের একটা উৎসাহজনক ভাব লোকের মনে জাগিয়া ওঠে।’[১৪]

১৯২৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকা পুনরায় লিখলো:

‘প্রত্যহ হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক মার্চ করিতেছে এবং অশ্বারোহী দলকে শিক্ষিত করা হইতেছে। স্বেচ্ছাসেবিকাগণ জয়ঢাক ও বিউগল বাজাইয়া প্যারেড করিতেছে। দেশবন্ধু নগরের দিকে অবিরাম জনস্রোত বহিতেছে। সেখানে রীতিমতো উৎসবের সাড়া পড়িয়া গিয়াছে।’[১৫]

কয়েক হাজার সদস্যের এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দ্বারা সামরিক কায়দায় সজ্জিত হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সুভাষ কংগ্রেস মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এই সময় সুভাষ কংগ্রেস সভাপতি মতিলাল নেহেরু’কে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। পরোক্ষভাবে এখানে তিনি একটি সামরিক বাহিনীর মহড়া প্রদর্শন করেন। এই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সই তখনকার কংগ্রেসের ছায়া সামরিক বাহিনী হিসেবে কাজ করে। এই বাহিনীই পরবর্তীকালের আজাদ হিন্দ ফৌজ’র অঙ্কুর। ১৯২৮ সাল থেকেই এই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীই সারা বাঙলার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকে।

সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের বক্তব্যের পর কংগ্রেসের সভাপতি মতিলাল নেহেরু তার ভাষণে বলেন:

‘স্বেচ্ছাসেবক দলের অপূর্ব বিধি-ব্যবস্থা, অশ্বারোহী ও পদাতিক দলের সুশৃঙ্খল নৈপুন্য, সর্বোত্র অধিবাসীদের স্বদেশপ্রেমের যে উদ্বেল লহরী নর্তণ লক্ষ্য করিয়াছি, তাহাতে স্বরাজ্য’র স্বপ্ন আমার মনে উদিত হইয়াছে।

আমি দেখিলাম, এখানকার প্রত্যেকেই এই অনুষ্ঠানটি সফল করিবার জন্য সাহায্য-সহযোগীতা করিতেছেন। আজ মনে হইতেছে আমরা সত্যিই বুঝি স্বাধীন, ভারতভূমি বুঝি সুখ ও সম্পদশালীনী হইয়াছেন। আপনারা আজ প্রমাণ করিয়াছেন যে, আপনারা সত্যিই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পদের যোগ্য অধিকারী। সেই অধিকারের বলেই স্বরাজ নিশ্চই আপনাদের করতলগত হইবে।’[১৬]

বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস নেতারা সুভাষের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু খুশী হতে পারলেন না একজন। তিনি হলেন অহিংস নীতির প্রবক্তা স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স-এর সর্বাধিনায়কের বেশে সুভাষের ওই তেজদীপ্ত চেহারাটাকে এতোটুকুও প্রসন্ন দৃষ্টিতে দেখতে পারলেন না মহাত্মা গান্ধী। তাই প্রকাশ্য ভাষণে তিনি বললেন, ‘এতো পার্ক সার্কাসের সার্কাস’। কেউ কেউ একটু এগিয়ে গিয়ে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সাথে কণ্ঠ মিলালেন; ‘খোকা ভগবান’ বলে কটুক্তি করলেন সুভাষকে। আসলে ওরা কেউই চাননি বাঙালিদের মধ্য থেকে একজন নেতা উঠে আসুক।

বিপ্লবী ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়’র ভাষায়:

‘কলিকাতা কংগ্রেস অধিবেশন বিপ্লবী ভারতের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কংগ্রেসের এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীই হলো আজাদ হিন্দ ফৌজ’র মূল ধারা।’[১৭]

বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীর অগ্রভাগে ছিলেন, বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ, সত্যরঞ্জন বকশী, সত্যগুপ্ত, মাস্টারদা সূর্যসেন, পূর্ণ দাস, যতীন দাস, পঞ্চানন চক্রবর্তী, প্রতুল ভট্টাচার্য, জগদীশ চ্যাটার্জী, বিনোদ চক্রবর্তী, যতীশ জোয়ার্দার, বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত, ননী চৌধুরী, সৌরভ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, গনেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, আবদুল খালেক প্রমুখ বিপ্লবীগণ এই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন। নারীদের গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল লতিকা বসু।

এই অধিবেশনে মতিলাল নেহেরু যখন গান্ধী প্রণিত ডোমেনিয়ন স্ট্যাটাস লাভের জন্য প্রস্তাব রাখেন, সুভাষ তখন প্রতিবাদ করেন। বাঙলার পতিনিধি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন সুভাষ। সুভাষ দীপ্ত কণ্ঠে বললেন:

‘ওই আধখানা স্বাধীনতা আমি চাইনে, আমি চাই পূর্ণ স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতায় কেনো খাদ নেই, শর্ত নেই; আছে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার অধিকার।’[১৮]

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরে উল্লেখিত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীর অগ্রভাগে যাঁরা ছিলেন সেই টিমে আমার দাদা আবদুল খালেক’র নামও এসেছে খোদ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনী’র নথিপত্র থেকে। আমি গর্বিত একজন মহান ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীর উত্তরসূরি হতে পেরে।)

তথ্যপঞ্জি:

১৪.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ ডিসেম্বর ১৯২৮
১৫.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৮
১৬.    আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৮
১৭.    বাঙলায় বিপ্লববাদ, নলিনী কিশোর গুহ আনন্দ পাবলিশার্স; কলকাতা ১৯৭৬
১৮.    আমি সুভাষ বলছি, শ্রী শৈলেশ দে, দে’জ পাবলিশার্স; কলকাতা ১৯৭৩

৬নং

সুভাষের তেজদীপ্ত প্রতিবাদের পরে নেহেরু স্বাধীনতা দাবির সংশোধনী আনেন। এই নেহেরুই তার রাজনৈতিক জীবনে কতোবার যে নিজেকে কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী বলে বিবৃতি দিয়েছেন তার হিসেব নেই। এবারও তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে সুভাষকে সমর্থন জানালেন। কিন্তু যখন ভোট গ্রহণ শুরু হলো তখন তিনি গান্ধীবাদী হয়ে গেলেন। ওই ভোটেই সুভাষ হেরে গেলেন ১৩৫০-৯৭৩ ভোটের ব্যবধানে। এই হার নীতিগত কারনে হয়নি, হয়েছিলো গান্ধীর কারনে। ভোট গ্রহণের পূর্বে একটি আশঙ্কার কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো প্রতিনিধিদের মধ্যে যে, ভোটে গান্ধী পরাজিত হলে নাকি কংগ্রেস ত্যাগ করে দূরে সরে যাবেন। ফলে উপস্থিত প্রতিনিধিগণ গান্ধীকে হারানোর ভয়ে যা করার তা-ই করলেন।

এই ভোটের পরেই সুভাষ তরুণদের আহ্বান জানিয়ে একটি তেজদীপ্ত ভাষণ দিলেন:

‘ভারতের যুবকেরা এখন হইতে আর প্রবীণ পক্বকেশ নেতাদের স্কন্ধে সব ভার নিক্ষেপ করিয়া জোড় হস্তে মূক মেষপালের মতো অনুগমন করিতে প্রস্তুত নহে। তাহারা বুঝিয়াছে স্বাধীন ও শক্তিমান ভারত তাহারাই গড়িবে। সেই দায়িত্ব তাহারা গ্রহণ করিয়াছে।

সবরমতী ভাবধারা তাহার প্রচারমুখে এই ধারণা জন্মাইবার চেষ্টা করিতেছে যে, আধুনিকতা খারাপ, কল-কারখানায় পর্যাপ্ত দ্রব্যজাত পণ্য তৈরি করা অন্যায়, অভাব বৃদ্ধি না করা অনুচিত, জীবনযাত্রার প্রয়োজন ও প্রাচুর্য বর্ধিত করা উচিত নহে। সর্ব প্রযত্নে গরুর গাড়ির যুগে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় এবং দৈহিক উন্নতি অথবা সামরিক শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করিয়া কেবল আত্মার উন্নতি সাধনই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ভারতে আমরা আজ কর্মযজ্ঞের সন্ধান চাই। আমাদের বর্তমানে যুগের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া বাঁচিতে হইবে। আমরা সর্বদ্বাররুদ্ধ জগতের কোণে বাস করিতে পারিবো না। তাই বলছি, গরুর গাড়ির দিন চলিয়া গিয়াছে। স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে ভারতমাতাকে সর্বদা অস্ত্রে-বর্মে সুসজ্জিত থাকতে হইবে।’[১৯]

সত্যরঞ্জন বক্সী ১৯২৯ সালের ২ জানুয়ারি ফরোয়ার্ড পত্রিকায় লেখেন:

‘গান্ধীর ডোমেনিয়ন স্ট্যাটাসের খসড়া তৈরি করার পরে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে যখন গান্ধীজী সুভাষকে স্বাক্ষর করতে বললেন তখন সুভাষ তাতে রাজী হলেন না। তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, আমার দাবী এই আধখানা স্বাধীনতা নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা। এ ব্যাপারে কোনো রকম আপোষ করতে আমি রাজী নই।’[২০]

১৯২৮ সালের ওই অধিবেশন ছিলো বিপ্লবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছিলো অহিংসবাদী ও আপোষকামী কংগ্রেস এবং সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের মিলিত একটি অধিবেশন। একসময় এই বিপরীতধর্মী স্রোতের মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর অবর্তমানে এগিয়ে এলেন তাঁরই রাজনৈতিক শিষ্য সুভাষ বসু। সুভাষের ডাকে অনুশীলন, যুগান্তর, আবদুল খালেক’র ফরিদপুরের সন্ত্রাসবাদী দল, পূর্ণ দাসের শান্তিসেনা, হেমচন্দ্র ঘোষের মুক্তিসংঘ, সূর্য সেন’র দল এবং উত্তর বঙ্গের দলগুলো, অনীল রায় ও লীলা রায়ের দীপালি সংঘসহ বাঙলার প্রায় সকল বিপ্লবী সংগঠনগুলো এই অধিবেশনে যোগ দেয়।

কংগ্রেস ওই অধিবেশন শেষে ভাবলো বিপ্লবীদের বাদ দিয়ে বাঙলার মন জয় করা সম্ভব নয়, বাঙলায় কংগ্রেসকে শক্তিশালী করাও সম্ভব নয়। বিপ্লবীরা মনে করলো কংগ্রেস সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ভারতের মুক্তিকামী জনগণকে বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলা যতোটা সহজ, ততোটা কোনো আন্ডাগ্রাউন্ড পার্টির ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

১৯২৯ সালের ১১ মে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেস ও যুব কংগ্রেস-এর যুব সম্মেলন উপলক্ষে সুভাষ চট্টগ্রাম যান। সেখানে অনন্ত সিং, গনেশ ঘোষ ও ত্রিপুরা সেনের সাথে কংগ্রেস এবং ভলান্টিয়ার্স বাহিনী নিয়ে আলোচনা করেন। সম্মেলনের পরে তিনি সেখানে একটি কর্মীসভা করেন। চট্টগ্রামে সেনগুপ্ত ও সুভাষ গ্রুপের সংঘর্ষে বিপ্লবী সুখেন্দু কলকাতার হাসপাতালে মারা গেলে সুভাষ খালি পায়ে কলকাতা শহরে শব মিছিলের নেতৃত্ব দেন।

এই বছরই তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এই সময় নোয়াখালী জেলার এক যুব সম্মেলনে ভাষণ দেন। তাঁর বক্তব্যে লাহোর ষড়যন্ত্রের আসামী শহীদ বিপ্লবী যতীন দাস-এর কথা উল্লেখ করে সুভাষ বলেন:

‘…বাংলাদেশের যুব সমাজের ভিতর থেকে সহস্র সহস্র যতীন দাস আমরা চাই, যারা তার আত্মোৎস্বর্গের ভাবকে রূপায়িত করবে। তীব্র জাতীয় চেতনাসম্পন্ন নতুন একদল যুবক আমাদের অবশ্যই চাই। কারণ, তারাই ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষকে নির্মাণ করবে। যে ভারতবর্ষে কৃষক-শ্রমিক নির্বিশেষে সকল নর-নারী স্বাধীনতার আশীর্বাদ উপভোগ করবে।

আপনাদের আমি আহ্বান করছি অদূর ভবিষ্যতে কি কি গৌরবময় ভূমিকা আপনাদের গ্রহণ করতে হবে তা অনুভব করুন। তারপর আপনারা অগ্রসর হয়ে চলুন একটি মাত্র ভাবনা নিয়ে, মাতৃভূমির মুক্তিব্রতই আমার একমাত্র কর্তব্য।’[২১]

১৯২৯ সালে লাহোরে কংগ্রেসের অধিবেশন আহ্বান করা হলো। এই কংগ্রেসেই সুভাষের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব পাশ হয়। কলকাতা কংগ্রেসে না মানলেও এবারই প্রথম মহাত্মা গান্ধী নিজ থেকেই স্বাধীনতার প্রস্তাব পেশ করলেন। সেই সঙ্গে আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে এই দাবী মেনে নিতে হবে। দাবী না মানলে শুরু হবে লাগাতার আইন অমান্য আন্দোলন।

সুভাষ বসু এই এই অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর প্রস্তাবে সংশোধনী এনে ভাষণ দেন। সংশোধনীতে সুভাষ বলেন:

‘ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তার ভারতীয় অনুচরদের অপসারিত করে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশে এই কংগ্রেস ভারতবর্ষে একটি পাল্টা সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতার অনুকূলে অবিরাম প্রচার অভিযান চালানোর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। …আমি চরমপন্থী, আমার নীতি হলো হয় সবটা চাই, নয়তো কিছুই চাই না।’[২২]

কিন্তু গোল বাঁধলো মহাত্মা গান্ধীর পরবর্তী একটি বক্তব্য নিয়ে। দেখা গেলো মহাত্মা গান্ধী মুখে পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বললেও, তিনি মনে-প্রাণে চাইছেন ডোমেনিয়ন স্ট্যাটাস।

তীব্র প্রতিবাদে ফেঁটে পড়লেন সুভাষ। মহাত্মা গান্ধীর সেই একঘেঁয়ে পুরনো কথা, সেই পুরনো দাবী! স্বাধীনতার প্রশ্নে শুধু সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। সুভাষের ভাষায়, ‘স্বাধীনতা শিশুর হাতের খেলনা নয়, চাইলেই তা পাওয়া যায় না। তার জন্য মূল্য দিতে হয়, সংগ্রাম করতে হয়। কোথায় তার প্রস্তুতি?’

তথ্যপঞ্জি:

১৯.    মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া, রমেশচন্দ্র মজুমদার, আনন্দ পাবলিশার্স; কলকাতা ১৯৬৫
২০.    সত্যরঞ্জন বক্সী’র নিবন্ধ, ফরোয়ার্ড পত্রিকা; ২ জানুয়ারি ১৯২৯
২১.    ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস, সুপ্রকাশ রায়, দে’জ পাবলিশার্স; কলকাতা ১৯৮৭
২২.    মৃত্যুঞ্জয়ী, তথ্য-সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার; ভারত, মার্চ ১৯৮২

চলবে